বাংলা

চীনের রেলপথে ট্রেন মেরামতকারী যুব প্রকৌশলীদের গল্প

CMGPublished: 2024-03-04 16:00:23
Share
Share this with Close
Messenger Pinterest LinkedIn

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের বিভিন্ন প্রদেশে অনেক রেলপথ তৈরি করা হয়েছে, এর সাথে দ্রুত গতির ট্রেনও চালু হয়েছে, রেলপথের যাতায়াত দিন দিন সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে চীনারা দেশের অভ্যন্তরে যাত্রায় বিমানের তুলনায় ট্রেনে করে যাতায়াত অনেক পছন্দ করেন। কারণ, ট্রেনের যাতায়াতে আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাব কম এবং সময়সূচি আরো সুনিপুন। আজকের অনুষ্ঠানে আমরা ট্রেন মেরামতকারী যুব প্রকৌলীদের গল্প তুলে ধরবো, বসন্ত উত্সবের ছুটিতে তারা কোটি কোটি চীনা যাত্রীর সফল যাত্রায় নিশ্চিতে ব্যাপক অবদান রেখেছেন।

বসন্ত উত্সব চলাকালে চীনের অনেক এলাকায় তুষার পড়েছে। আনহুই প্রদেশের হ্যফেই শহরেও সাদা দুনিয়ায় পরিণত হয়েছে, আবহাওয়া তুষারের কারণে আরো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তবে, প্রচন্ড বাতাসের মধ্যে ট্রেন মেরামতকারী যুব প্রকৌশলীরা ব্যস্ততার মধ্যে কাজ করছেন এবং ট্রেনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরীক্ষা ও মেরামত করছেন।

যুব প্রকৌশলীরা ট্রেনের মাথা, মাঝখানে ও পিছনে তিনটি অংশ ভাগ করে সংশ্লিষ্ট মেরামত ও পরীক্ষা কাজ করেন, প্রত্যেক দলে ২ জন থাকেন এবং মেয়ে জু লিন তাদের মধ্যে একজন, যিনি ভারি ব্যাটারি টেনে নিয়ে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা করেন, প্রতি মাসে ট্রেনের ব্যাটারি চেক করতে হয় এবং প্রতিটি ব্যাটারির ওজন ১০০ কেজিরও বেশি। এটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও যথাযথ পরীক্ষা করতে হয়।

একজন মেয়ের জন্য ১০০ কেজি বেশ ভারি, তবে মেয়ে জু লিন মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষার কাজ করেন। ব্যাটারির লাইনসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্রাংশের বিস্তারিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। হাতুড়ি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় স্পর্শ ও নক করেন তিনি এবং জটিল লাইনের বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ ক্যাবিনেটসহ কোনো সমস্যা খুঁজে পেলে তিনি তা মেরামত করতে পারেন। এ সম্পর্কে প্রকৌশলী মেয়ে জু বলেন, ট্রেনের ব্যাটারির সাসপেনশন বোল্ট কোনো ঢিলেঢালা বা ক্ষতিকর থাকলে হবে না, নাহলে ট্রেন চলাচলে দুর্ঘটনা ঘটবে, তাই ট্রেনের নিরাপদ যাতায়াতে নিশ্চিত করতে হয়।

২০২০ সালে মেয়ে জু লিন হুনান রেলপথ বিজ্ঞান প্রযুক্তি কারিগরি স্কুল থেকে স্নাতক পাস করেন এবং ট্রেন মেরামতকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁর কর্মদল নিয়মিতভাবে ট্রেনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম মেরামত ও পরীক্ষা করে, একদম ট্রেনের ‘ক্লিনিকের’ মতো।

মেয়েরা মাত্রই সৌন্দর্য পছন্দ করে, তবে ট্রেন মেরামতকারীদের কাজ ক্লান্তিকর ও নোংরা। তাই মেয়েদের জন্য এ কাজের চ্যালেঞ্জ বেশি। মেয়ে জু লিন বলেন, প্রতিদিন ব্যাটারি ও মেরামত সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করতে হয়, তাই কাজের সময় কখনো মেকআপ করি না।

তাঁর কর্মদলের সিনিয়ার কর্মীরা মেয়ে জু লিনের আগ্রহ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে, জু মনে করেন, কেবল ট্রেনের মেরামত কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করে, পরে আরো জটিল কাজ করা সম্ভব। প্রতিবার যখন ট্রেনের সরঞ্জামের সমস্যা সমাধান করেন, তখন তা তাঁর জন্য বেশ আনন্দের ব্যাপার।

গত কয়েক বছর ধরে পরিশ্রমী চর্চার মাধ্যমে মেরামতে অনেক দক্ষতা অর্জন করেছেন জু। প্রতিবার নতুন ধরনের সরঞ্জাম মেরামত করা তাঁর জন্য গর্বের ব্যাপার, তার কাজ থেকে বিদ্যুত সরঞ্জামের নিরাপত্তার ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এ কারণে তিনি অফিস থেকে অনেক পুরস্কার ও প্রশংসাও পেয়েছেন।

এবার ছেলে ইয়াং হাও ইউয়ানের গল্প শুনব।

ছেলে ইয়াং হাও ইউয়ান ২০২৩ সালে চীনের লানচৌ পরিবহন বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি প্রকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক হয়েছেন। তিনিও প্রতিদিন কাজের পোশাক পরে বৈদ্যুতিক ড্রিল ধরে ট্রেনের নিচে শুয়ে বিভিন্ন মেরামত কাজ করে থাকেন। শুরুর দিকে দৈনিক মেরামত কাজ তাঁর জন্য বেশ কঠিন ব্যাপার ছিল। কারণ, তার পড়াশোনার বিষয় এবং বাস্তব কাজে অনেক পার্থক্য রয়েছে, তাই ট্রেন মেরামতের বিস্তারিত বিষয়ে অনেক শেখার বিষয় থাকে। নতুন করে সিনিয়র কর্মীদের কাছ থেকে মেরামত পদ্ধতি শিখতে হয়। ট্রেনের হিটিং ডিভাইসের পরীক্ষা, পরিষ্কার ও নবায়ন কাজ তাঁর জন্য সবচেয়ে কঠিন।

হিটিং ব্যবস্থাপনা ট্রেনের পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, একটি ট্রেনের মধ্যে কমপক্ষে ৩০টি ডিভাইস স্থাপন করা হয়। প্রত্যেক বগিতে আইসি ডিভাইসের পরীক্ষা ও পরিষ্কার কাজ করতে হয়। বিভিন্ন সংযুক্তির স্থাপনা ও লাইন সুসংবদ্ধ করতে হয় এবং বিদ্যুত্ লাইনের চালু নিশ্চিত করতে হয়।

এ কাজে যোগ দেওয়ার পর ছেলে ইয়াং হাও ইউয়ান অনেক অজানা তথ্য খুঁজে পেয়েছেন। তাই কাজের কর্মদক্ষতার উন্নয়নে তিনি বিদ্যুত্ প্রকৌশলী নিয়ে অনেক বই কিনেছেন এবং প্রতিদিন সংশ্লিষ্ট জ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কাজের সময় তিনি সিনিয়র কর্মীদের মেরামত পদ্ধতি ও পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করেন, বিভিন্ন সমস্যা মেরামতের টিপস শেখার চেষ্টা করেন, প্রতিদিন ব্যস্ত মেরামত কাজ শেষ করার পর রাতের সময়ও বিভিন্ন পেশাদার প্রযুক্তিগত শব্দ নিয়ে গবেষণা করেন। দিন রাত ধরে পরিশ্রমী পড়াশোনার পর তিনি বিদ্যুত্ যন্ত্রাংশ ও মাপের সরঞ্জাম প্রয়োগসহ বিভিন্ন জ্ঞান শিখতে সক্ষম হন এবং ট্রেনের হিটিং ডিভাইস মেরামতের দক্ষতাও লাভ করেন।

আসলে ট্রেনের হিটিং ডিভাইস মেরামত কাজ অনেক কষ্টের ব্যাপার, হিটিং ডিভাইস ট্রেনের নিচে স্থাপন করা হয়। প্রতি বগিতে ২৫ সেটের ডিভাইসের ৫৪টি হিটিং বৈদ্যুতিক রেডিয়েটার রয়েছে। তাই প্রতিদিন শতাধিকবারের মতো নামতে হয় ও শুতে হয় এসব মেরামতের জন্য। তবে মনোযোগ ও পরিশ্রমের কারণে ছেলে ইয়াং চমত্কার মেরামতের দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি বসন্ত উত্সব চলাকালে যাত্রীদের যাতায়াত নিশ্চিত করায় ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে এটি একজন ট্রেন রক্ষকের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

চীনা মেডিকেল শিক্ষার্থী টিসিএমে প্রাণ বাঁচালো অসুস্থ নারীর

সম্প্রতি চীনের সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও সবার নজর কেড়েছে। চীনা মেডিসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে সাবওয়েতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এক নারীর জ্ঞান ফিরিয়ে আনেন। এ ভিডিও পোস্ট করার পর ভাইরাল হয়। চীনা সংবাদদাতা ওই শিক্ষার্থীকে খুঁজে বের করেন এবং তার সাক্ষাৎকার নেন।

ওই শিক্ষার্থীর নাম শি ইউয়ে যিনি বেইজিংয়ে চীনা মেডিসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যিক চীনা মেডিসিন (টিসিএম) বিভাগের মাস্টার্স শিক্ষার্থী। ১৭ জানুয়ারি বেইজিংয়ের ৫ নম্বর সাবওয়েতে একজন মধ্যবয়সী নারী যাত্রী হঠাত্ অজ্ঞান হয়ে যান। তখন সাবওয়ের যাত্রীরা তাকে ধরে সাবওয়ে স্টেশনের আসনে শুইয়ে দেন। শি ইউয়ে একই বগিতে ছিলেন, তিনি আকুপাংচার আর জীবাণুমুক্ত অ্যালকোহল প্যাড দিয়ে নারীর জ্ঞান ফিরিয়ে আনেন। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

চীনা নেটিজনরা শিক্ষার্থী শি ইউয়ে’র চমৎকার আকুপাংচার প্রযুক্তি দেখে ব্যাপক প্রশংসা করেন। তারা মনে করেন, চীনা ঐতিহ্যিক চিকিৎসা পদ্ধতি বেশ কার্যকর এবং অপরিচিত একজন মানুষকে এভাবে শুশ্রুষা করাটাও হৃদয়গ্রাহী।

সাক্ষাৎকারে ছাত্রী শি ইউয়ে বলেন, রোগীর শুশ্রুষা করা আমার দায়িত্ব, কারণ আমার পড়াশোনার বিষয় চীনা ঐতিহ্যবাহী মেডিসিন। অনেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন আমার সাথে আকুপাংচার সরঞ্জাম থাকে। আসলে সেদিন আমি আকুপাংচার পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে ওই ঘটনাটি ঘটেছে।

এক মধ্যবয়সী নারী যাত্রী আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সাবওয়ে একটি স্টেশনে প্রবেশের আগে তিনি হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। তাঁর মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং ডাকাডাকিতে তিনি সাড়া দিচ্ছিলেন না। তখন আমি তাঁর হৃদস্পন্দন পরীক্ষা করি, তাঁকে অনেক দুর্বল মনে হয় এবং আমার ধারণা করি, তিনি হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে চিনির মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। সাবওয়ে স্টেশনে পৌঁছে কর্মীরা অ্যাম্বুলেন্স ডাকে। সে সময় নারী যাত্রীর হৃদস্পন্দন মেপে শিক্ষার্থী শি ইউয়ে আকুপাংচার সরঞ্জাম দিয়ে তাঁর হাত ও মুখসহ কয়েকটি পয়েন্টে আকুপাংচার করেন। কয়েকবার আকুপাংচার করার পর অজ্ঞান নারীর জ্ঞান ফিরে আসে। তখন শি ইউয়ে দ্রুত তার পরীক্ষায় অংশ নিতে চলে যান।

সেই নারীর জ্ঞান ফিরিয়ে আনার অভিজ্ঞতা স্মরণ করে শি বলেন, যদিও তিনি এখন মাস্টার্স শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা করছেন, তবে, ইতোমধ্যে চিকিৎসকের যোগ্যতার পরীক্ষায় পাস করেছেন। তাই জরুরি অবস্থায় তিনি চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করে রোগীর প্রাণরক্ষা করতে পারেন।

সাক্ষাৎকারে শি বার বার বলেন যে, হঠাৎ অজ্ঞান রোগীর অসুস্থতার কারণ সঠিকভাবে জানার পর চিকিৎসার পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এমনি এমনি আকুপাংচার দেওয়া যাবে না। যারা রক্তে চিনির মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে অজ্ঞান হন, তাদের চেতনা ঠিক হওয়ার পর চিনিসহ পানি বা মিছরি খাওয়ানো যাবে, তবে, অজ্ঞান অবস্থায় খাওয়ানো বিপজ্জনক ব্যাপার।

Share this story on

Messenger Pinterest LinkedIn