আকাশ ছুঁতে চাই ৮৫
যা রয়েছে এবারের পর্বে
১. বন্যায় নিদারুণ কষ্টে বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা
২. লাইভ স্ট্রিমিং করে গ্রামবাসীকে আয়ের পথ দেখালেন চাং সিয়াওহোং
নারী ও শিশু বিষয়ক অনুষ্ঠান আকাশ ছুঁতে চাই থেকে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি শান্তা মারিয়া। আমাদের অনুষ্ঠানে আমরা কথা বলি নারী ও শিশুর অগ্রযাত্রা, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, সাফল্য, সংকট সম্ভাবনা নিয়ে। আমরা কথা বলি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের অধিকার নিয়ে।
বন্যায় নিদারুণ কষ্টে বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা
স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার সম্মুখীন হয়েছে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চল। এই বন্যায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নারী ও শিশুদের উপর। বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে এসে বিস্তারিত জানাচ্ছেন আফরিন মিম।
টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তলিয়ে গেছে বাংলাদেশের ১১টি জেলার নিম্নাঞ্চল। এবারের বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বিভিন্ন জেলার কয়েক লাখ মানুষ। আর এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছে নারী ও শিশুরা।
এবারের বন্যায় অবর্ণনীয় এমন দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে কুমিল্লা, ফেনী, খাগড়াছড়িসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলের নারী ও শিশু। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় কুমিল্লা জেলার লাকসাম ও বুড়িচং উপজেলার নারী ও শিশুরা কেউ ঘরবন্দি আবার কেউবা আশ্রয়কেন্দ্রে স্থান নিয়েছে।
লাকসাম উপজেলার কাদ্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয় নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা মনজুমা বেগম জানান। স্বামী সন্তান নিয়ে এখানেই দিন-কাটছে তার।
মনজুমা বলেন, ঘরের অর্ধেক পর্যন্ত পানি । খাটের উপরও যা রাখছি সব ভেসে গেছে। পথের মধ্যে পানি। ভাসতে ভাসতে এখানে আসছি। এখানে অনেক গেদারিং। তাও সবাই মিলেই আছি”।
ঘরের সব ভেসে গেছে পানিতে। তারপরও অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে ঘরেই পড়ে আছেন স্থানীয় বাসিন্দা এবারত খাতুন। তিনি জানায়, “ আমার একটা রুগি অসুস্থ ।ঘরের মধ্যে পইরা রইছে। খাওয়া-দাওয়া নাই। ঘর দুয়ার চুলায় নিয়া গেছে। ”
নিজ বাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়ি যাচ্ছেন শাহীনা সুলতানা। সঙ্গে তার মুরগি। তিনি জানান
‘সব পানিতে ভেসে গেছে। এখন বাপের বাড়ি যাচ্ছি। ঐখানে পানি ওঠে নাই। আমার যখন পানি কমবো তখন ফিরে আসবো”।
একই এলাকার বাসিন্দা শাহিদা বেগম। ছোট বাচ্চাদের স্কুলে রেখে নিজে বাড়িতেই রয়ে গেছে।
তিনি জানায়, ‘ সবাইরে স্কুলে দিয়ে আইছি। এইখানে আমি একাই থাকতেছি। কনরকম চলতেছে। কোন কিছু খাওয়ার পাই না। সকাল থেকে কিছু খাই নাই’।
বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। আর তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারীই থাকে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। এ সময় লবণাক্ত পানির পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই এবারের বন্যায় নোংরা, লবণাক্ত পানির কারণে নারীরা বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খুব স্বাভাবিকভাবে গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই এই সময় গর্ভবতী ও স্তন্যদাত্রী নারীরা অনেক বেশি কষ্টের সম্মুখীন হচ্ছেন। স্যানিটারি ন্যাপকিন, গর্ভবতী মায়ের উপকরণ সহজলভ্য হয় না। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে নেই ঋতুকালীন নারীদের উপযুক্ত পরিবেশ। তাই নোংরা পানি বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশনের কারণও হতে পারে। তাইতো আশ্রয়কেন্দ্রের অনিরাপদ পরিবেশে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে।
প্রতিবেদন : আফরিন মিম
সম্পাদনা: শান্তা মারিয়া
লাইভ স্ট্রিমিং করে গ্রামবাসীকে আয়ের পথ দেখালেন চাং সিয়াওহোং
উত্তর পশ্চিম চীনের নিংসিয়া হুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের এক নারী চাং সিয়াওহোং । তিনি একজন ভেড়ার খামারী। লাইভস্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে চাং এখন তার গ্রামের সেলিব্রিটি। কিভাবে সম্ভব হলো এই সাফল্য? শুনবো সেই গল্প।
উত্তর পশ্চিম চীনের নিংসিয়া হুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের কৃষকরা তাদের পণ্য বিক্রির জন্য বেছে নিয়েছেন লাইভ স্ট্রিমিং পদ্ধতিকে। এই পদ্ধতিতে তারা সারা চীনে নিজেদের বিশেষ পণ্য যেমন গোজি বেরি, ভেড়া ও গরুর মাংস বিক্রি করছেন।
লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি খামার থেকে বিক্রি হচ্ছে ভেড়া। গ্রামবাসী খামারীরা নিজেরাই কৃষিপণ্য বিক্রির মাধ্যমে তাদের আয় বৃদ্ধি করছেন।
গ্রামবাসীদের এই কাজে পথ দেখিয়েছেন একজন নারী । চাং সিয়াওহোং প্রথম এইভাবে নিজের খামার ভেড়া বিক্রি শুরু করেন। তিনি তার স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে , ইমেজ পাঠিয়ে প্রতিদিন পারিবারিক খামারের ভেড়া বিক্রি করেন।
চাং সিয়াওহোং বলেন, ‘প্রথম যখন লাইভ স্ট্রিমিং করি তখন আমি শুদ্ধভাবে কথাও বলতে পারতাম না। তবে প্রথম প্রচেষ্টাতেই আমি ১০টি ভেড়া বিক্রি করে দারুণ আনন্দ পাই। তখন থেকে বিক্রি বাড়ছে। আমি প্রতিদিন একশ দুইশ ,তিনশ ভেড়াও বিক্রি করতে পারি। একদিনে এমনকি আটশ ভেড়াও বিক্রি করেছি।’
নিংসিয়া হুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের চোংনিং কাউন্টির তাচানছাং গ্রামের অধিবাসীরা এভাবেই বিভিন্ন পণ্য সরাসরি বিক্রি করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলছেন। তবে লাইভ স্ট্রিমিং শেখাটা চাং এর জন্য সহজ হয়নি। চার বছর আগে যখন প্রথম লাইভ স্ট্রিমিং শুরু করেন তখন ঠিকভাবে গুছিয়ে কথা বলতেও পারতেন না। তবে তিনি বুঝতে পারেন এইভাবে বাজারজাত করণের মাধ্যমে বিক্রি অনেক বেশি করা সম্ভব।
চাংয়ের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তাচানছাং টাউনের ৭৯ হাজার বাসিন্দা অনলাইন কমার্সে আগ্রহী হন। এই টাউনের ৬৩ শতাংশ হুই জাতিগোষ্ঠীর মানুষ।
মাটন, বিফের পাশাপাশি এখানকার আরেকটি জনপ্রিয় কৃষিপণ্য গোজি বেরি। ২০২০ সালের পর থেকে এখানে লাইভ স্ট্রিমারদের সংখ্যা বাড়ে। কাউন্টির প্রথম সোশ্যাল মিডিয়া ইনকিউবেশন বেস প্রতিষ্ঠিত হয়। লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে গোজি বেরিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিক্রি হয়।
ইনকিউবেশন বেসের মাধ্যমে লাইভস্ট্রিমিং ক্রেজ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ বিষয়ক নীতি ও চর্চা সংক্রান্ত জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে অনেক কৃষকের মধ্যে। এজন্য স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা কৃষকদের কিভাবে যথাযথ প্রক্রিয়ায় লাইভস্ট্রিমিং করতে হয় তা শেখাচ্ছেন। ইয়ুয়ানফ্যং গ্রামের পার্টি সেক্রেটারি লি সিংমেই। তিনি একজন উদ্যোগী নারী। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি প্রশিক্ষণ সেশন পরিচালনা করেছি ।তাদেরকে লাইভস্ট্রিমিং কিভাবে করতে হয় সেটা শিখিয়েছি। জনমত ও অনলাইন রেপুটেশন বিষয়ে সচেতন করেছি। আমি সাধারণত আমার লাইভস্ট্রিমিংয়ে নীতিসমূহ নিয়ে কথা বলি।বিশেষ করে গ্রামীণ গৃহনির্মাণ, কৃষি ও পশুখামার স্থাপনে সরকারের ভর্তুকি সুবিধাগুলো জানাই। আমরা কয়েক ডজন ভিউয়ার দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন ত্রিশ জন থেকে তা দুইহাজার, তিনহাজার, এমনকি পাঁচ হাজারে পৌছেছে।’
ইয়ুয়ানফ্যং গ্রাম লাইভ স্ট্রিমার, গ্রামীণ সমবায় ও কৃষকদের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি মডেল স্থাপন করেছে এবং ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশনসহ পণ্য বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা করছে।
গ্রামের অনেক নারী এ থেকে উপকৃত হচ্ছেন। ইয়ুয়ানফ্যং গ্রামের একজন নারী লিন সাইসিয়া বলেন, ‘গ্রামীণ প্লাটফর্মের মাধ্যমে তিন মাসে ২০ হাজার ইউয়ানের বেশি আয় করেছেন তিনি।’
তাচানছাং গ্রামে এখন ১১৩জন নিয়মিত লাইভস্ট্রিমার আছেন যারা গত তিন বছরে ১৭০ মিলিয়ন ইউয়ানের বেশি বিক্রি করেছেন এবং ছয় শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।
প্রতিবেদন: শান্তা মারিয়া
সম্পাদনা: ফয়সল আবদুল্লাহ
সিছুয়ানের টুর গাইড নারী ওয়াং লি
চীনে এখন অনেক নারী টুর গাইড হিসেবে বেশ সফল ক্যারিয়ার গড়ছেন। এমন একজন নারীর গল্প বলবেন হোসনে মোবারক সৌরভ
চীনের সিছুয়ান প্রদেশের একজন নারী টুর গাইড ওয়াং লি। তিনি থাওফিং ছিয়াং গ্রামের এক বাসিন্দা। তিনি জানান, চীনের একটি সাম্প্রতিক প্রবণতা হলো চলচ্চিত্রে কোন স্থান দেখানো হলে সে জায়গার প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। এই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে সম্প্রতি তার ক্যারিয়ার জমে উঠেছে। সম্প্রতি তার গ্রামে একটি চলচ্চিত্রের শুটিং হয়। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর এই গ্রাম দেখতে আসছেন অনেক দেশি বিদেশি পর্যটক।
ওয়াং লি টিবেটান এথিনিক পোশাক পরেন এবং পর্যটকদের সিনেমার গল্প বলে আরও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।
সুপ্রিয় শ্রোতা। আকাশ ছুঁতে চাই অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে পৌছে গেছি আমরা। সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি আমি শান্তা মারিয়া। আবার কথা হবে আগামি সপ্তাহে। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। চাই চিয়েন।
সার্বিক সম্পাদনা : ইয়ু কুয়াং ইউয়ে আনন্দী
লেখা, গ্রন্থনা ও উপস্থাপনা: শান্তা মারিয়া
অডিও সম্পাদনা: হোসনে মোবারক সৌরভ