আকাশ ছুঁতে চাই ৭৩
১. প্রতিবন্ধী নারীদের কর্মসংস্থানে নতুন প্রকল্প
২. প্রত্নতাত্ত্বিক নারী ওয়াং রুই-এর জীবন
নারী ও শিশু বিষয়ক অনুষ্ঠান আকাশ ছুঁতে চাই থেকে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি শান্তা মারিয়া। আমাদের অনুষ্ঠানে আমরা কথা বলি নারী ও শিশুর অগ্রযাত্রা, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, সাফল্য, সংকট সম্ভাবনা নিয়ে। আমরা কথা বলি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের অধিকার নিয়ে।
ওসি: চীনের কুয়াংতোং প্রদেশের শেনচেন সিটিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো ২০তম চায়না ইন্টারন্যাশনাল কালচারাল ইন্ডাস্ট্রিজ ফেয়ার। এই সাংস্কৃতিক শিল্পমেলায় প্রথমবারের মতো শুরু করা হয় প্রতিবন্ধী নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য একটি প্রকল্প। এই প্রকল্পর স্টলে প্রতিবন্ধী নারীদের তৈরি বিভিন্ন রকম কারুশিল্প দেখে অনেকেই মুগ্ধ হন। বিস্তারিত প্রতিবেদনে
দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে দেখছেন চমৎকার কারুশিল্প। ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প তৈরি করছেন নারী। ২০তম চায়না ইন্টারন্যাশনাল কালচারাল ইন্ডাস্ট্রিজ ফেয়ার (আই সি আই এফ) বা আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক শিল্প মেলায় দেখা গেছে এমন দৃশ্য। সদ্য সমাপ্ত এই সাংস্কৃতিক শিল্প মেলায় নজর কেড়ে নেয় একটি স্টল। প্রতিবন্ধী নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য একটি প্রকল্পের উদ্বোধন হয় এই মেলায়।
জাতীয় অবৈষয়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একজন ধারক চাং ইয়ানমেই বলেন, ‘আমি এখন মিয়াও এমব্রয়ডারি করছি। কুইচৌ প্রদেশের ছিয়ানতোংনান মিয়াও এবং তোং স্বায়ত্তশাসিত প্রিফেকচারের বসবাসরত মিয়াও জাতির ঐতিহ্য ধারণ করে এই এমব্রয়ডারি। এটি বেবি ক্যারিয়ার স্ট্র্যাপ। এর মাধ্যমে স্থানীয় নারীরা তাদের শিশুদের বহন করে। আমরা প্রাচীন নকশার সঙ্গে আধুনিক ডিজাইনের ধারণা যুক্ত করেছি। রঙের ব্যবহারে এনেছি নতুনত্ব। মিয়াও এমব্রয়ডারির বিশেষ কিছু স্টিচ ও নকশা ব্যবহার করেছি। এগুলো আধুনিক দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। ’
শেনেচেন সিটিতে অনুষ্ঠিত পাঁচদিনের এই মেলায় ১ লাখ ২০ হাজার পণ্য প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রতিবন্ধী নারীদের তৈরি পণ্যগুলো। ‘সুন্দরী কর্মশালা’ নাম দিয়ে এই প্রকল্প চালু করা হয়। চায়না ডিজঅ্যাবেলড পারসনস ফেডারেশন, অল চায়না উইমেন’স ফেডারেশন, জনসম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প উদ্বোধন হয়।
কর্মশালার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী নারীদের তৈরি পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী কিছু কারুশিল্প। বেইজিং সিল্ক শিল্প, কাপড়ের উপর টিবেটান বৌদ্ধ পেইন্টিং যেটি থাংকা নামে পরিচিত, খড় ও মাছের আঁশের তৈরি নানা রকম চিত্র ইত্যাদি।
নকশী কারুকাজ করা বিভিন্ন কাপড় ও ব্যবহার্যসামগ্রী ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এতে প্রতিবন্ধী নারীদের কর্মসংস্থানের পথ প্রসারিত হয়।
কুইচৌর লিপিং কাউন্টির লু ইয়ংচিয়াং অগ্নি দুর্ঘটনায় শৈশবেই প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। এই দুর্ভাগ্যের পরও দমে না গিয়ে নিজের ধৈর্য, অধ্যবসায় আর প্রতিভার মাধ্যমে তিনি নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন তেমনি স্থানীয় অন্য অনেক প্রতিবন্ধী নারীর কর্মসংস্থানের পথ করে দিয়েছেন।
লু ইয়ংচিয়াং বলেন, ‘আমি শৈশব থেকেই একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ভালো কিছু নীতির মাধ্যমে আমি উপকৃত হয়েছি। আমি ৭০ থেকে ৮০ জন এমব্রয়ডারি শিল্পীর দলকে নেতৃত্ব দিই। আমরা বুনন, এমব্রয়ডারি, ডাইং, ব্রোকেডের মাধ্যমে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল পণ্য তৈরি করি। সমাজের সর্ব স্তরের মানুষের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছি। এর মাধ্যমে আমরা নিজেদের খাবার নিজেরাই উপার্জন করছি। মিয়াও এখনিক টাউন এবং তোং এথনিক গ্রামগুলোতে কাজ করার মাধ্যমে গ্রামীণ পুনরুজ্জীবনেও অবদান রাখছি।’
প্রতিবন্ধী নারীদের কর্মসংস্থানের এই প্রকল্প নারীদের আত্মনির্ভরশীলত হতে সাহায্য করছে।
এই বছরের মেলায় সারবিশ্ব থেকে সরকারি বেসরকারি সংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংস্থার ছয় হাজারের বেশি প্রতিনিধি অনলাইন ও অফলাইনে যোগ দেন। গত বছরের চেয়ে এবছর অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
২০০৪ সালে প্রথম এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে চীনের সাংস্কৃতিক শিল্পক্ষেত্রের উন্নয়ন ও বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে এই মেলা।
প্রতিবেদন : শান্তা মারিয়া
সম্পাদনা: ফয়সল আবদুল্লাহ
প্রত্নতাত্ত্বিক নারী ওয়াং রুই-এর জীবন
ক্যারিয়ার গড়ার জন্য এখনকার বেশিরভাগ চীনা তরুণ-তরুণী ছুটছে তাদের যার যার স্বপ্নের পেছনে। তাদের মধ্যে আছেন ২৮ বছর বয়সী ওয়াং রুই। তিনি চীনের সিছুয়ান প্রদেশের সানসিংতুই প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ স্থানে কাজ করেন। চীনের সিছুয়ান প্রদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাগারের তরুণ বিশেষজ্ঞ ওয়াং রুই। অনেকের কাছে প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে কাজ করাটা বিরক্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু এই তরুণ নারী এ কাজে যোগ দিতে দ্বিধা করেননি। ওয়াং রুইয়ের গল্পটা শোনা যাক এবার।
তার স্বপ্নের সূচনার কথা স্মরণ করে ওয়াং রুই বলেছিলেন "ছোটবেলা থেকেই, ইতিহাসের প্রতি আমার যথেষ্ঠ অনুরাগ ছিল। কেন্দ্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভির বিজ্ঞান ও শিক্ষা চ্যানেলে তথ্যচিত্র দেখার সময়, আমি কল্পনা করেছিলাম যে, প্রত্নতাত্ত্বিকের কাজটি এরকম হতে পারে: সকালে, সূর্যালোক ও কুয়াশার কোলে, একদল লোক মাঠে কিছু কাজ শুরু করে, যা খুবই আকর্ষণীয় বলে মনে হয়েছিল।"
মূলত ১৯২০ এর দশকের শেষ দিকে আবিষ্কৃত সানসিংতুই ধ্বংসাবশেষকে ২০ শতাব্দীতে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের মধ্যে একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ধ্বংসাবশেষকে প্রাচীনকালের শু রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ বলে মনে করা হতো, যা প্রায় ৩০০০ থেকে ৪৫০০ বছর আগের।
প্রত্নতাত্ত্বিক ওয়াং রুই একজন সাহসী ও পরিশ্রমী নারী যিনি কঠোর পরিশ্রমের পেশা বেছে নিয়েছেন।
ওয়াং রুই বলেন, "এটি একটি অন্ধ বাক্স খোলার মতো। এখানে, ক্ষেতে রেপসিড ফুল ফোটে, ধান ফলে, আপাতদৃষ্টিতে সবই একই রকম। তবুও, পৃষ্ঠের মাটি থেকে খোসা ছাড়ালে, কেউ সং রাজবংশের (৯৬০-১১২৭) অবশিষ্টাংশ উন্মোচন করতে পারে, হান রাজবংশ (খ্রিস্টপূর্ব ২০২- খ্রিস্টাব্দ ২২০), বা এমনকি সাং এবং চৌ রাজবংশের (খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০- খ্রিস্টপূর্ব ২৫৬) অথবা নিওলিথিক যুগের মাটির নীচে সমাহিত নিদর্শনগুলো ভিন্ন, যা বেশ আকর্ষণীয়। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেছিলেন যে তিনি তার যৌবনে প্রত্নতত্ত্ব অধ্যয়ন করতে চেয়েছিলেন।”
প্রত্নতাত্ত্বিক কাজের উচ্চ ব্যয় এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে সি চিন পিং এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।
২০২৩ সালের ২৬ জুলাই, সি ছুয়ান প্রদেশের দ্য ইয়াং শহরে সানসিংতুই জাদুঘরের নতুন ভবন পরিদর্শন করেন সি চিন পিং। তিনি সেখানকার সাংস্কৃতিক নিদর্শনগুলোর প্রতি গভীর আগ্রহ দেখান। প্রদর্শনীর মধ্যে ওয়াং রুই এবং তার সহকর্মীরা সানসিংতুই ধ্বংসাবশেষের ৪নম্বর বলিদান গর্ত থেকে আহরণ করা জিনিসপত্র আছে।
পরিদর্শনকালে সি চিন পিং-এর মন্তব্য ওয়াং রুই-এর মতো তরুণ প্রত্নতাত্ত্বিকদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
ওয়াং রুই বলেন, "সাধারণ সম্পাদক সি বলেছিলেন যে, সানসিংতুইতে প্রত্নতাত্ত্বিক অর্জনগুলো বিশ্বে সুপরিচিত এবং আমাদের ফলপ্রসূ প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। আমরা সবাই মনে করি যে, সাধারণ সম্পাদক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রচেষ্টার প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। আমি অনুভব করি যে, আমি যা করি তা অন্যরা দেখে, এবং তা দেশে গুরুত্ব পাচ্ছে।"
ওয়াং বলেন যে, সানসিংতুই জাদুঘরে সি’র সফর তার এবং অন্য তরুণদের ক্যারিয়ারের পছন্দকে প্রভাবিত করেছে।
সানসিংতুই-এর জনপ্রিয়তা চীনা সংস্কৃতির উদ্ভব সম্পর্কে জনসাধারণের আগ্রহের জন্ম দিয়েছে, তরুণদের মধ্যে প্রত্নতত্ত্বের প্রতি নতুন করে আবেগ জাগিয়েছে। ওয়াং-এর মতো তরুণ প্রত্নতাত্ত্বিকরা সত্যিই পরিবর্তনগুলো অনুভব করেছেন।
ওয়াং রুই বলেন, "যেহেতু দেশটি এ বিষয়ে আরও মনোযোগ দিতে শুরু করেছে, প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মী নিয়োগ সম্প্রসারণ করেছে, তরুণদের আরও চাকরির সুযোগ করে দিয়েছে। তরুণরা বিভিন্ন সহায়ক নীতি খুঁজে পেয়েছে, যার মধ্যে মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম রয়েছে, সিনিয়র প্রত্নতাত্ত্বিকরা ছোটদের গাইড ও সমর্থন করেছেন।"
ওয়াং রুই তার কাজ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
ওয়াং বলেন, "১৯৯০ দশকে জন্মগ্রহণকারী তরুণরা উল্লেখযোগ্য সামাজিক পরিবর্তনের সময়ে বাস করছে। আমার শৈশব থেকেই এমন পরিবর্তন শুরু হয়েছে। এটি এমন একটি যুগ হতে পারে যা অতীত এবং ভবিষ্যতের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। আমাদের তরুণরা বয়স্ক প্রজন্মের কাছ থেকে বৈশিষ্ট্যগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পায়, তরুণ প্রজন্মের বৈশিষ্ট থাকাকালীন আমরা রক্ষণশীল এবং উদ্যমী উভয় মান বজায় রাখব, আমি আশা করি যে, আমি এখন যা করছি তা ধরে রাখব। "
প্রতিবেদন: শুয়েই ফেই ফেই শিখা
সম্পাদনা: শান্তা/তৌহিদ
সুপ্রিয় শ্রোতা আকাশ ছুঁতে চাই অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে পৌছে গেছি আমরা।
অনুষ্ঠানটি কেমন লাগছে সে বিষয়ে জানাতে পারেন আমাদের কাছে। আপনাদের যে কোন পরামর্শ, মতামত সাদরে গৃহীত হবে। আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি আমি শান্তা মারিয়া। আবার কথা হবে আগামি সপ্তাহে। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। চাই চিয়েন ।
সার্বিক সম্পাদনা : ইয়ু কুয়াং ইউয়ে আনন্দী
লেখা, গ্রন্থনা ও উপস্থাপনা: শান্তা মারিয়া
অডিও সম্পাদনা: হোসনে মোবারক সৌরভ