আকাশ ছুঁতে চাই ৪২
১. দুই বোনের হাত ধরে পালটে গেছে গ্রামীণ নারীদের জীবন
২. শক্তিশালী চীন গঠনে নারীর অবদান অনেক
৩. তারা অন্য নারীদের চোখে জয়ের স্বপ্ন এঁকে দিয়েছেন
নারী ও শিশু বিষয়ক অনুষ্ঠান আকাশ ছুঁতে চাই থেকে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি শান্তা মারিয়া। আমাদের অনুষ্ঠানে আমরা কথা বলি নারী ও শিশুর অগ্রযাত্রা, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, সাফল্য, সংকট সম্ভাবনা নিয়ে। আমরা কথা বলি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের অধিকার নিয়ে।
দুই বোনের হাত ধরে পালটে গেছে গ্রামীণ নারীদের জীবন
চীনের উদ্যোগী নারীরা দেশগঠনে বড় ভূমিকা রাখছেন। দুই বোনের উদ্যোগে পালটে গেছে গ্রামীণ নারীদের জীবন । একসময় কৃষি কাজে জীবিকা নির্বাহ করা নারীরা এখন হস্তশিল্প থেকে আয় করছেন। নিজে সাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি পরিবারেও রাখছেন ভূমিকা। ইনার মঙ্গোলিয়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের থোয়ানচিয়ে থোন গ্রাম ঘুরে এসে দুই বোনের এই উদ্যাগের গল্প শুনাবেন আফরিন মিম।
হুয়াং চিন পিং ও হুয়াং ইয়েন পিং দুই জমজ বোন। ৪০ বছর বয়সী এই দুই নারী ইনার মঙ্গোলিয়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের কুই লিউ হ্যুও উপজেলার থোয়ানচিয়ে থোন গ্রামের বাসিন্দা।
গ্রামের অন্যান্য নারীর মতই এই দুই নারীর ঘরের কাজ, ভেড়া পালন, ঘোড়া পালন ও কৃষি কাজই ছিলো মূল কাজ। বিবাহিত এই দুই বোন কিন্তু এখন একটি কারখানার মালিক। চলতি বছরের মার্চ থেকে শুরু করেছেন এই কারখানা।
এই কারখানায় তৈরি হয় রঙ বেরঙের ব্যাগ। মূলত স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য এই ব্যাগ তৈরি করে থাকেন তারা। হ্যুপেই প্রদেশের একটি কোম্পানি থেকে অর্ডার পেয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডেলিভারি পৌছে দেন কোম্পানির মালিকের কাছে।
প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া সহজ ছিল না তাদের জন্য। কেননা তাদের খুব কম মানুষের সাথে জানাশোনা ছিল। নিজের প্রচেষ্টায় হ্যুপেই প্রদেশে গিয়ে একটি কারখানায় শিখেন ব্যাগ তৈরির কাজ। খুব ভালোভাবে শিখে সেখান থেকেই পান ব্যাগের অর্ডার। বাড়ি ফিরে এসে শুরু করেন ব্যাগ তৈরি।
এ প্রসঙ্গে হুয়াং চিন পিং সিএমজি বাংলাকে জানান, প্রথম আমরা দুই বোন গ্রাম থেকে হ্যুপেই প্রদেশে গিয়ে থাকা শুরু করি। প্রথমে আমরা সেই শহরে কাউকে চিনতাম না। পরবর্তীতে একটি কোম্পানিতে গিয়ে কাজ শেখা শুরু করি। মাসখানেকের মধ্যেই আমরা প্রশিক্ষণ নিয়ে ভালোমতো ব্যাগ বানাতে শিখে যাই। এরপর আমরা সেখান থেকে অর্ডার নিয়ে এসে ব্যাগ বানাতে শুরু করি। প্রথম দিকে প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে আমার দিন অতিবাহিত হয়েছে। তবে আমরা তা কাটিয়ে উঠেছি”।
নিজেদের বাড়ির একটি পরিত্যাক্ত বাড়িকে ব্যবহার করেন ব্যাগ তৈরির কারখানা হিসবে। একজন দুই জন করে ৩০ থেকে ৬৩ বছর বয়সী গ্রামের ১২০ জন নারী কাজ করেন তার কারখানায়।
হুয়াং ইয়েন পিং সিএমজি বাংলাকে জানান, “আমাদের এখানে নারীরা সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কাজ করে। এখানে কাজ করে তারা যে টাকা পায় তা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াও করান। দিন যত যাচ্ছে আমাদের এখানে অনেক নারী কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। আমরা আমাদের ভাগ্যবদলের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের জীবন পালটে দিতে পেরে খুব খুশি”।
এই কারখানায় কাজ করে নারীরা এখন সাবলম্বী। প্রতিমাসে এখন থেকে আয় করছেন তিন হাজার ইউয়ান। চিন পিং ও ইয়েন পিংয়ের মত তাদের দৈনন্দিন কাজেও এসেছে পরিবর্তন।পাশাপাশি পরিবারেও রাখছেন ভূমিকা।
নিজ বাড়িতেই এই কারখানার পাশপাশি কৃষিকাজেও ভূমিকা রাখছেন এই উদ্যোক্তা দুই নারী। বাড়ির পাশে ভুট্টার বাগানে পরিবারের সদস্যদের সাহায্য করেন তারা।
দুই বোনের এই জীবন পালটে যাওয়ার গল্পে অবদান রেখেন তার পরিবার। মানসিকভাবে সাহস যোগোনোর পাশাপাশি কাজের সাহায্য করেন তারা।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ - আফরিন মিম
সম্পাদনা: শান্তা মারিয়া
শক্তিশালী চীন গঠনে নারীর অবদান অনেক
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয় চীনের ১৩তম জাতীয় নারী কংগ্রেস। চীনের নারীদের জাতীয় জীবনে বিশাল গুরুত্ব বহন করে এই কংগ্রেস।
শক্তিশালী দেশ গঠন এবং পুনর্জগরনে নারীর অবদানকে তুলে ধরা হয় সদ্য সমাপ্ত চীনের ১৩তম জাতীয় নারী কংগ্রেসে। ২৩ থেকে ২৬ অক্টোবর বেইজিংয়ে মহা গণভবনে অনুষ্ঠিত হয় চীনা নারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সম্মেলন। অল চায়না উইমেন ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট এবং চাইনিজ স্টেট কাউন্সিলর শ্যন ইছিন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সামগ্রিক নেতৃত্বকে সমুন্নত ও শক্তিশালী করার, দেশের সামগ্রিক স্বার্থ সংরক্ষণ এবং নারীদের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করার প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং, চাও লেচি, ওয়াং হুনিং, ছাই ছি, লি সিসহ চীন সরকার ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির(সিপিসি) নেতৃবৃন্দ নারী কংগ্রেসের সকলকে অভিনন্দন জানান।
হংকং এবং ম্যাকাও বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল থেকে ৯০ জন বিশেষভাবে আমন্ত্রিত প্রতিনিধি সহ প্রায় ১৮০০জন প্রতিনিধি কংগ্রেসে অংশ নেন।
ক্যাপশন: ১৩তম জাতীয় নারী কংগ্রেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং
সিপিসি কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে বক্তব্য রাখেন ভাইস প্রিমিয়ার তিং সুয়েসিয়াং।
তিং দ্বাদশ জাতীয় নারী কংগ্রেসের পর থেকে চীনা নারীদের অসাধারণ অবদানের কথা তুলে ধরেন।
ক্যাপশন: ১৩তম জাতীয় নারী কংগ্রেস
তিনি দারিদ্র্য বিমোচনে তাদের অধ্যবসায় এবং কঠোর পরিশ্রম, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে তাদের উৎকর্ষ সাধনা, কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় তাদের সাহসিকতা, পরিবার ও সম্প্রদায়ে তাদের সক্রিয় ভূমিকা, আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য তাদের নিষ্ঠা এবং ক্রীড়াক্ষেত্রে তাদের অসামান্য অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন।
চাইনিজ পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্সের (সিপিপিসিসি) ন্যাশনাল কমিটির ভাইস চেয়ারপারসন এবং কংগ্রেসের প্রেসিডিয়াম এক্সিকিউটিভ চেয়ারপারসন শেন ইউয়েউ কংগ্রেসের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। বৈঠকে, শেন ইউয়েউ একটি শক্তিশালী দেশ গঠনে এবং জাতীয় পুনর্জাগরণ অর্জনে নারীদের অবদানের প্রচেষ্টাকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুপ্রেরণামূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন।
প্রতিবেদন শান্তা মারিয়া
তারা অন্য নারীদের চোখে জয়ের স্বপ্ন এঁকে দিয়েছেন
১৩তম জাতীয় নারী কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন এমন দুজন প্রতিনিধির গল্প শুনবো এখন। শুনবো কিভাবে তারা অন্য নারীদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন।
সুই ইওয়েন এবং ওয়ান রুইসুয়ে। দুই তরুণী। দুজনেরই জন্ম ১৯৯০ এর দশকে। তারা তাদের পরিশ্রম, বীরত্ব, মেধা ও আন্তরিকতায় সৃষ্টি করেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। তারা ১৩তম জাতীয় নারী কংগ্রেসে ডেলিগেট হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
সুই ইওয়েন একজন সাহসী নারী। বর্তমানে তিনি চেচিয়াং প্রদেশের নিংবো পাবলিক সিকিউরিটি ব্যুরোর হাইটেক জোন শাখায় কর্মরত আছেন। তিনি একজন পুলিশ অফিসার।
২০১৯ সালের মাচংচ মাসের ঘটনা। সুই এবং তার সহপাঠী বান্ধবী রাতের বেলা হোস্টেলে ফিরছিলেন। হঠাৎ করে একজন ব্যক্তি ছুরি হাতে তাদের আক্রমণ করে। সুই তার বান্ধবীকে রক্ষা করার জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নেন। তিনি বন্ধুকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিজে ছুরিকাঘাতের মোকাবেলা করেন। হামলাকারী তাদের ছুরিকাঘাত করে। বন্ধুকে বাঁচানোর জন্য সুই নিজের শরীর দিয়ে তাকে আড়াল করেন এবং দৃঢ়ভাবে হামলাকারীকে প্রতিহত করেন।
এই সাহসিকতার জন্য সুই পরে অনেক প্রশংসা ও সম্মান পেয়েছেন। তাকে জাতীয় আদর্শিক রোল মডেল অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে। তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্য মানুষকে বাঁচিয়েছেন। তিনি ন্যাশনাল ৮ মার্চ রেড ব্যানার পেয়েছেন। জাতীয় বীরের সম্মান পেয়েছেন।
হাংচৌ ১৯তম এশিয়ান গেমসে মশাল বহনের সম্মানও অর্জন করেছেন।
সুই এক সামরিক অফিসার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এ বছর পুলিশ অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তিনি নারী পুলিশ অফিসারদের ইমেজ উজ্জ্বল করার জন্য প্রতিজ্ঞা করেছেন। ন্যাশনাল উইমেন কংগ্রেসে তিনি যোগ দিয়ে এর নীতিমালার প্রতি দৃঢ় আস্থা ব্যক্ত করেছেন।
ওয়ান রুইসুয়ে একজন গবেষক।
তিনি ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে পিএইচডি করেছেন। তিনি ২০২২ সালে ১৭তম চায়না ইয়ুথ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সম্মাননা অর্জন করেছেন। তিনি এখন ওয়েস্টলেক বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছেন। বিজ্ঞানের জটিল গবেষণায় তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন।
চ্যালেঞ্জিং গবেষণায় তার আত্মনিয়োগ তাকে অন্য নারীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস করে তুলেছে।
প্রতিবেদন: শান্তা মারিয়া
সম্পাদনা: রহমান
সুপ্রিয় শ্রোতা আকাশ ছুঁতে চাই অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে পৌছে গেছি আমরা।
অনুষ্ঠানটি কেমন লাগছে সে বিষয়ে জানাতে পারেন আমাদের কাছে। আপনাদের যে কোন পরামর্শ, মতামত সাদরে গৃহীত হবে। আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি আমি শান্তা মারিয়া। আবার কথা হবে আগামি সপ্তাহে। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। চাই চিয়েন।
সার্বিক সম্পাদনা : ইয়ু কুয়াং ইউয়ে আনন্দী
লেখা, গ্রন্থনা ও উপস্থাপনা: শান্তা মারিয়া
কণ্ঠ: আফরিন মিম, শান্তা মারিয়া, শুভ আনোয়ার
অডিও সম্পাদনা: রফিক বিপুল